একজন জামান সাহেবের গল্প
মিঃ সারোয়ার জামান, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, জানালার বাহিরের তাকিয়ে বাহিরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে ই এখন তার দিন কাটে। আজ প্রায় ছয় মাস হলো সে এই নির্জন ঘরটিতে একা একা বাস করছেন । কিন্তু এই ছয় মাসের মধ্যে একবার ও কেউ তাকে দেখতে আসেননি। সবশেষ ছোট ছেলে রায়হানের কাছেই ছিল। ছয়মাস আগে সরকারি চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে কানাডায় পাড়ি জমান। প্রায় দুই বছর আগে প্রায় প্রিয় জীবন সংগিনীকে হারিয়ে একরকম নির্বাক ই হয়ে গিয়েছিলেন। দুই ছেলে এবং এক মেয়ে নিয়ে খুব সুখেই কাটছিল তার সংসার। হঠাৎ কি ঝড়ে আল্লাহ তায়া’লা সবকিছু এলো মেলো করে দিলেন। বড় ছেলে ফয়সাল দশ বছর আগে থেকেই অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। সেখানেই তার সংসার জীবন গড়ে উঠেছে। ভাবছিলেন ছোট ছেলের সাথেই সারাজীবন কাটিয়ে দিবেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্য আর হলো কই? বিধাতা যেন তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। একমাত্র মেয়ে সামিয়া জামান স্বামীর চাকুরির সুবাদে রাজশাহীতে অবস্থান করছেন, মেয়েটি ও একবার এসে খবর নেয় নি, ফোন করে জানতে ও চায়নি যে, তার বৃদ্ধ বাবা কেমন আছে।
চিত্রঃ বাবা ও ছেলে
বাড়ির একমাত্র কাজের লোক আবদুল কাদের ই এখন তার দেখা শুনা করছেন। আপন জন সবাই তাকে ছেড়ে চলে গেলে ও বাড়ির কাজের লোক আবদুল কাদের কিন্তু তাকে ফেলে যেতে পারেনি, কোন এক বিবেকের তাড়নায় বা মায়ার টানে সে এখানেই পড়ে আছে। দুনিয়ায় কোন অর্থ, কিংবা লোভ-লালসা তাকে গ্রাস করতে পারেনি। আজ জামান সাহেব বুজতে পেরেছেন টাকা-পয়সার লোভ সবাইকেই গ্রাস করলে ও গরীব এই লোকটিকে কিন্তু দুনিয়ায় কোন মোহ ই গ্রাস করতে পারেনি। কথাটা ভাবতে ভাবতেই তার চোখে পানি এসে যায়। কি লাভ হলো এত কষ্ট করে ছেলে মেয়েদের মানুষ করে আজ জীবনের শেষ সময় এসে কাউকেই কাছে পাচ্ছেন না। জীবনের সব রোজগার ই তো ছেলে-মেয়েদের পিছনে ব্যয় করেছেন। আজ চলার মত এতটুকু অর্থ ও তার কাছে জমা নেই। আজ মনে হচ্ছে জীবনে সবচেয়ে বড় ভুলটাই করেছেন ছেলে-মেয়েদের মানুষ করে। তার প্রতি কাজের মানুষটার যে ভালোবাসা ও মায়া-মমতা আছে, তা যদি তার সন্তানদের মধ্যে এতটুকু পরিমান থাকতো তাহলে ও তার তার মনে এতটা কষ্ট থাকতো না। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করেই তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল, কথা বলতে বলতে তিনি আবার ও কেদে ফেললেন। বোঝা গেল না কে তাকে ফোনটা দিয়েছে, তবে এটুকু বোঝা গেল যে অন্তত তার সন্তানেরা কেউ ফোন দেই নি।

চিত্রঃ বৃদ্ধ বয়সে বাবা।
বাস্তবতা হলো আমরা যারা আমাদের সন্তানদেরকে মানুষ করার জন্যে জীবনের সব কিছু শেষ করে দিচ্ছি, তারা শুধু একটা বিষয় খেয়াল করব যে, আমাদের সন্তানেরা সঠিক শিক্ষা নিয়ে সত্যিকারে মানুষ হচ্ছে কিনা, না আমাদের সবাই কেই জামান সাহেবের মত পরিনাম হতে পারে।
